ডুয়ার্সের আকাশে নিভে গেল এক উজ্জ্বল নক্ষত্র \\ A Bright Star Fades from the Skies of Dooars


ডুয়ার্সের আকাশে নিভে গেল এক উজ্জ্বল নক্ষত্র


ডাঃ পার্থপ্রতিম: বিজ্ঞানমনস্কতা, মানবতা ও সমাজসেবার এক অনন্য প্রতীক

ডাঃ পার্থপ্রতিম— এই নামেই তিনি পরিচিত হতে ভালোবাসতেন। নিজের নামের সঙ্গে কোনও পদবি ব্যবহার করতেন না। সমাজে প্রচলিত জাতপাত, বর্ণভেদ ও ধর্মীয় বিভাজনের বিরুদ্ধে এটিকেই তিনি তাঁর প্রথম নীরব প্রতিবাদ বলে মনে করতেন। ছোটবেলা থেকেই তিনি বিজ্ঞানমনস্ক চিন্তাধারা ও যুক্তিবাদী আন্দোলনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েন এবং পরবর্তীকালে উত্তরবঙ্গের অন্যতম পরিচিত বিজ্ঞানকর্মী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।


বিজ্ঞানচর্চা ও জনসচেতনতার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান ছিল বহুমাত্রিক। পূর্ব ভারত থেকে শুরু করে সর্বভারতীয় স্তরের অসংখ্য স্বাস্থ্য ও বিজ্ঞান বিষয়ক সেমিনারে তিনি সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। তাঁর উদ্ভাবিত ‘ওয়াটার টেলিস্কোপ’ বা জলদূরবীন বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়েছিল। এই উদ্ভাবনের জন্য তিনি তৎকালীন রাষ্ট্রপতি নীলম সঞ্জীব রেড্ডির প্রশংসাপত্র লাভ করেন। একই সঙ্গে শীলা দীক্ষিত, এস. বি. চবনসহ একাধিক কেন্দ্রীয় মন্ত্রীও তাঁর এই অভিনব উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেন।


১৯৮৮ সালে তিনি ‘ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কাল্টিভেশন অব সায়েন্স’-এ বৈজ্ঞানিক সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম বিষয়ক বিশেষ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। ভারত সরকারের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগের পৃষ্ঠপোষকতায় আয়োজিত এই প্রশিক্ষণ তাঁর বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণের কাজকে আরও সুসংহত করে।


১৯৯১ ও ১৯৯২ সালে পরপর দুই বছর তিনি অল ইন্ডিয়া সায়েন্স ক্লাব কনফারেন্সের প্রধান সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯১ সালে পূর্ব ভারতের প্রতিনিধি হিসেবে নাগপুরে অনুষ্ঠিত ‘ইকোলজি অ্যান্ড স্পিরিচুয়ালিটি’ বিষয়ক জাতীয় বিতর্কসভায় অংশগ্রহণ করেন। এছাড়া বিজয়ওয়াড়ায় অনুষ্ঠিত অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস কনফারেন্সে পশ্চিমবঙ্গের প্রতিনিধিত্ব করে প্রদর্শক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

তাঁর কর্মকাণ্ড কেবল সংগঠন পরিচালনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। সাহিত্য ও বিজ্ঞানকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য তিনি নিয়মিত লেখালেখি করতেন। তাঁর প্রবন্ধ, ছোটগল্প, কবিতা, রম্যরচনা ও বিজ্ঞানভিত্তিক ধাঁধা আনন্দবাজার পত্রিকা, আজকাল, সানন্দা, গণশক্তি, বর্তমান, উত্তরবঙ্গ সংবাদ, জ্ঞান-বিজ্ঞান, জ্ঞান-বিচিত্রা (ত্রিপুরা) এবং বাংলাদেশের জনপ্রিয় স্বাস্থ্যপত্রিকা ‘মাসিক জনস্বাস্থ্য’-সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠিত সংবাদপত্র ও সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে।


তিনি উত্তরবঙ্গ সংবাদ এবং সংবাদ পত্রিকার স্বাস্থ্য বিভাগের নিয়মিত লেখক ছিলেন। বিজ্ঞানভিত্তিক দেওয়াল পত্রিকা ‘পাসপোর্ট’-এর সম্পাদক হিসেবেও তিনি পরিচিতি লাভ করেন। দূরদর্শন, আকাশবাণী কলকাতা ও শিলিগুড়ির বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে তিনি বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা করেছেন। কখনও প্রযুক্তির মৌলিক ধারণা, কখনও পরিবেশ সংরক্ষণ, আবার কখনও জনস্বাস্থ্য বিষয়ক সচেতনতামূলক বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি সাধারণ মানুষের কাছে বিজ্ঞানের বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন।


বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি বহু সম্মানে ভূষিত হন। দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশন (ডিভিসি) তাঁকে ‘সায়েন্স অ্যাওয়ার্ড’-এ সম্মানিত করে, যা তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল অধ্যাপক নুরুল হাসান তাঁর হাতে তুলে দেন। ১৯৮০ সালে তিনি জাতীয় শিক্ষানীতি ও গবেষণা পরিষদ (এনসিইআরটি)-এর ‘মেরিট অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করেন। পরবর্তীকালে ‘ন্যাশনাল সায়েন্স ডে অ্যাওয়ার্ড ২০০২’, ‘কিরাত ভূমি অ্যাওয়ার্ড’, উত্তরবঙ্গ নাট্যজগতের বিশেষ সংবর্ধনা এবং ‘সায়েন্স অ্যাওয়ারনেস রিপ্লিকা অ্যাওয়ার্ড ২০০৪-০৫’ সহ একাধিক সম্মানে সম্মানিত হন।


২০১১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আনন্দবাজার পত্রিকা গোষ্ঠীর জনপ্রিয় পাক্ষিক পত্রিকা ‘আনন্দলোক’ তাঁকে ‘সেলাম বেঙ্গল’ সম্মানে ভূষিত করে। এরও আগে, ৭ এপ্রিল ২০০৪ সালে আনন্দবাজার পত্রিকা ‘উত্তরের নায়ক’ শিরোনামে তাঁর জীবন ও কর্মকাণ্ডের উপর একটি বিশদ প্রতিবেদন প্রকাশ করে।


ডুয়ার্স অঞ্চলে কুসংস্কার দূরীকরণ, বিজ্ঞানমনস্কতা গড়ে তোলা এবং বিশেষত আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে তিনি ‘ডুয়ার্স এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড অ্যাডভান্সমেন্ট রেভেইলি’ (ডিয়ার বা DEAR) নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী বিজ্ঞানভিত্তিক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সংগঠন মানুষের আস্থা ও জনপ্রিয়তা অর্জন করে। পাশাপাশি তিনি আরও বহু সামাজিক ও জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।


তাঁর রচিত ‘হৃদয়ের কথা’ গ্রন্থটি হৃদরোগ ও হৃদযন্ত্রের পরিচর্যা বিষয়ক একটি উল্লেখযোগ্য বাংলা বই। প্রকাশের পরপরই বইটি সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে। আনন্দবাজার পত্রিকা, দেশ, সাপ্তাহিক বর্তমান, আজকালসহ বিভিন্ন সংবাদপত্র ও সাময়িকীতে বইটির প্রশংসাসূচক পর্যালোচনা প্রকাশিত হয়।


পেশাগত ব্যস্ততার মধ্যেও তাঁর ছিল নানা সৃজনশীল শখ। বাগান করা, আলোকচিত্র গ্রহণ, দূরবীক্ষণ যন্ত্রে রাতের আকাশ পর্যবেক্ষণ— এসব ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী। চিকিৎসক হিসেবে কাজের ফাঁকে তিনি গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ঘুরে মানুষের সঙ্গে মিশেছেন, তাঁদের সমস্যা বুঝেছেন এবং সচেতনতার আলো পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।


২০১১ সালের গোর্খাল্যান্ড আন্দোলনের অস্থির সময়ে ডুয়ার্সে সাম্প্রদায়িক ও জাতিগত সম্প্রীতি বজায় রাখতে ‘ডুয়ার্স দিবস’ উদ্‌যাপনের ক্ষেত্রে তাঁর উদ্যোগ বিশেষ ভূমিকা পালন করে। সেই সময় তাঁর প্রচেষ্টা অঞ্চলে শান্তি ও সহাবস্থানের পরিবেশ রক্ষায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল।


ডাঃ পার্থপ্রতিম সারাজীবন এমন এক পৃথিবীর স্বপ্ন দেখেছেন, যেখানে থাকবে না রোগ, বৈষম্য কিংবা কুসংস্কার। জনস্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য তিনি রঙিন ট্রান্সপারেন্সি প্রজেক্টরের মাধ্যমে মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, হৃদরোগ, উচ্চ ও নিম্ন রক্তচাপ, ডায়াবেটিস এবং নানা রোগের কারণ, প্রতিরোধ ও চিকিৎসা পদ্ধতি সাধারণ মানুষের সামনে উপস্থাপন করতেন। তাঁর এই অনুষ্ঠানগুলোতে থাকত গান, আবহসঙ্গীত এবং তাঁর সহজ-সরল অথচ হৃদয়গ্রাহী উপস্থাপনা।


ডাঃ পার্থপ্রতিমের বিশ্বাস ছিল— “রোগ সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান, নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন এবং সুষম খাদ্যাভ্যাস মানুষকে বহু মারাত্মক অসুখ থেকে রক্ষা করতে পারে। সামাজিক কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাস দূরে সরিয়ে স্বাস্থ্য সচেতনতার সঠিক প্রয়োগই অকালমৃত্যু প্রতিরোধের অন্যতম উপায়।”


সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, জনসচেতনতার উদ্দেশ্যে পরিচালিত তাঁর এই সমস্ত কর্মসূচি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে অনুষ্ঠিত হতো। মানুষের কল্যাণই ছিল তাঁর একমাত্র লক্ষ্য।


বিজ্ঞান, মানবতা, সমাজসেবা ও যুক্তিবাদী চেতনার এক বিরল সংমিশ্রণ ছিলেন ডাঃ পার্থপ্রতিম। তাঁর জীবন ও কর্ম আগামী প্রজন্মের কাছে প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ